খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই জানুয়ারি ২০১৫, ১২:৩৬ পিএম
বাংলাদেশ তথা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রে যে কয়েকটি অঞ্চল তাদের হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাস, আভিজাত্য আর সংস্কৃতির গৌরব নিয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তাদের মধ্যে বগুড়া জেলা অন্যতম। ‘বগুড়া’ নামটা শুনলেই অবহারিতভাবে চোখের সামনে ভেসে ওঠে মাটির সরায় জমিয়ে রাখা গাঢ় ক্ষীরের মতো সুস্বাদু মিষ্টি দই। আর মগজের কোণায় উঁকি দেয় আড়াই হাজার বছর আগের প্রাচীন এক সমৃদ্ধ নগরী। মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন কিংবা মুঘল—ইতিহাসের কত যে উত্থান-পতনের নীরব সাক্ষী এই জনপদ, তার ইয়ত্তা নেই।
খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে মহান সম্রাট অশোকের রাজত্বকাল থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক সময় পর্যন্ত, বগুড়া নিজের বুকে ধারণ করে রেখেছে এক প্রাচীন ঐতিহ্য। এটি কেবল একটি জেলা নয়, এটি যেন প্রাচীন বাংলার এক জীবন্ত টাইম মেশিন। চলুন, কোনো কৃত্রিম বা যান্ত্রিক উপায়ে নয়, একদম মন ছুঁয়ে যাওয়া এক ভ্রমণপিপাসু মন নিয়ে বিস্তারিতভাবে জেনে নিই বগুড়া জেলা ঠিক কোন কোন জাদুকরী কারণে বিশ্বজুড়ে এত বিখ্যাত।
বগুড়া বললেই অবধারিতভাবে সবার আগে যার নাম জিভে জল এনে দেয়, তা হলো এখানকার ঐতিহ্যবাহী দই। স্বাদে ও গুণে অতুলনীয় হওয়ায় এই দই কেবল বাংলাদেশে নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও এক অনন্য ব্র্যান্ড। এর গৌরবময় স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৩ সালে ‘বগুড়ার সরার দই’ অফিশিয়ালভাবে ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই (GI) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। দই মূলত দুধের ব্যাকটেরিয়ার গাঁজন বা ফার্মেন্টেশনের মাধ্যমে তৈরি এক অদ্ভুত দুগ্ধজাত খাদ্য। সারা দেশে দই পাওয়া গেলেও, বগুড়ার দইয়ের স্বাদ ও টেক্সচারের কোনো বিকল্প আজ পর্যন্ত তৈরি হয়নি।
এই দইয়ের খ্যাতি কিন্তু আজকের নয়, এর মূল বিস্তার ঘটেছিল ব্রিটিশ আমলে। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ষাটের দশকের প্রথম ভাগে ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ থেকে শুরু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউস পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল বগুড়ার দইয়ের স্বাদ। সে সময় পাকিস্তানের তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্তাদের সহানুভূতি ও মন জয় করতে উপহার হিসেবে এই অনন্য দই পাঠিয়েছিলেন।
বগুড়ার দইয়ের এই জয়যাত্রার ইতিহাস শুরু হয়েছিল বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলা থেকে। স্থানীয় ইতিহাস মতে, সনাতন ঘোষ সম্প্রদায়ের মানুষেরা তাদের হাতের জাদুতে প্রথম এই দই তৈরি করে বগুড়াকে দেশের সর্বত্র পরিচিত করে তোলেন। পরবর্তীতে এই ঘোষ পরিবারের হাত ধরে ধীরে ধীরে দই তৈরির শিল্পটি মুসলিম সম্প্রদায়সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের অধীনে চলে আসে এবং একটি বৃহৎ শিল্পে রূপ নেয়।
জানা যায়, প্রায় আড়াইশ বছর আগে শেরপুরের ঘোষ পরিবারের ‘ঘেটু ঘোষ’ বা ‘গৌর গোপাল ঘোষ’ নামের ব্যক্তিরা প্রথম বাণিজ্যিকভাবে দই তৈরি শুরু করেন। প্রথম দিকে এটি টক দই হিসেবে তৈরি হলেও, বংশ পরম্পরায় তাদের হাত ধরে এটি ক্ষীরসা মণ্ডার মতো মিষ্টি বা ‘চিনিপাতা দইয়ে’ রূপান্তরিত হয়। কালের বিবর্তনে এই দইয়ের বহুমুখী ব্যবহার শুরু হয়েছে—টক দই এখন ব্যবহৃত হয় ঐতিহ্যবাহী মেজবানের রান্না ও পুষ্টিকর ঘোল তৈরিতে, আর যেকোনো শুভ কাজ কিংবা অতিথি আপ্যায়নে মিষ্টি দই তো এক প্রকার বাধ্যতামূলক। বর্তমানে শেরপুরের দইয়ের পাশাপাশি বগুড়া শহরের এশিয়া সুইটস, আকবরিয়া, মহররম আলী ও শ্যামলীর দই বেশ নামকরা।
বগুড়া শহর থেকে মাত্র ১১ কিলোমিটার উত্তরে গেলেই দেখা মিলবে ইতিহাসের আরেক মহাবিস্ময়—মহাস্থানগড়, যা একসময় প্রাচীন বাংলার অন্যতম প্রধান রাজ্য পুণ্ড্রবর্ধনের রাজধানী ছিল এবং সে যুগে এর নাম ছিল ‘পুণ্ড্রনগর’। এটি খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দী থেকে খ্রিস্টীয় ১২ শতক পর্যন্ত, অর্থাৎ মৌর্য সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে পাল ও সেন রাজবংশের সময়কাল পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে পুরো পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে প্রাণবন্ত প্রশাসনিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল।
প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ এবং প্রাচীন সাহিত্যের বর্ণনা প্রমাণ করে যে, এটি ছিল এক মহৎ ও সুপরিকল্পিত নগরী। পোড়ামাটির সুউচ্চ প্রাচীর, বিশাল প্রবেশদ্বার, রাজপ্রাসাদ, সাধারণ মানুষের আবাসন, বড় অ্যাসেম্বলি হল, মন্দির, বৌদ্ধ বিহার, সুড়ঙ্গ, দিঘি এবং শহরতলির মন্দিরগুলো এই প্রাচীন শহরের প্রধান বৈশিষ্ট্য। খ্রিস্টীয় ৭ম শতাব্দীতে বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক ও তীর্থযাত্রী জুয়ানজাং (যাকে আমরা হিউয়েন সাং নামে চিনি) এই পুণ্ড্রনগর পরিদর্শন করেছিলেন। তিনি তাঁর ভ্রমণকাহিনিতে এই শহরের চোখ জুড়ানো দিঘি, ফলের বাগান, রকমারি ফুল ও আনন্দ উদ্যানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করে গেছেন।
বর্তমানে এই স্থানটি ইউনেস্কোর একটি সম্ভাব্য বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান (UNESCO World Heritage Site) এবং বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। এখানকার ইতিহাসকে খুব কাছ থেকে দেখতে পর্যটকদের জন্য রয়েছে ‘মহাস্থানগড় জাদুঘর’। করতোয়া নদীর তীরে অবস্থিত এই দুর্গের ভেতরে ও বাইরে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যের ফলে বিভিন্ন প্রাচীন মুদ্রা, জপমালা, পোড়ামাটির ফলক এবং গুপ্ত ও পাল যুগের বহু মূল্যবান লিপি বা শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়েছে, যা আমাদের প্রাচীন ইতিহাসের অকাট্য দলিল।
মহাস্থানগড় শুধু একটি ঢিবি নয়, এর আশেপাশে কয়েক কিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ঐতিহাসিক স্থাপনা, যা দেখার জন্য দেশ-বিদেশ থেকে ইতিহাসবিদ ও পর্যটকরা ছুটে আসেন।
মহাস্থানগড় থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দক্ষিণে গোকুল গ্রামে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক প্রত্নস্থলটি স্থানীয়ভাবে ‘বেহুলার বাসর ঘর’ নামে পরিচিত। তবে প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এটি মূলত একটি প্রাচীন শিব মন্দির বা বৌদ্ধ স্তূপের ভিত্তি মঞ্চ। আনুমানিক ২ডি বা ৩য় শতকে নির্মিত এই বিশাল বহুতল কাঠামোর ভেতরের স্থাপত্যশৈলী সত্যিই অবাক করার মতো। ১৭১টি ত্রিকোণাকার কক্ষের এই অনন্য বিন্যাস প্রাচীন বাংলার প্রকৌশলবিদ্যার এক অনন্য নিদর্শন।
মহাস্থানগড়ের পূর্ব পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক করতোয়া নদীর তীরে এই ঘাটটি অবস্থিত। লোককাহিনী অনুযায়ী, পুণ্ড্রবর্ধনের শেষ হিন্দু রাজা পরশুরামের বোন শীলদেবী এখানে স্নান করে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। প্রতি বছর হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এখানে এসে পবিত্র স্নান বা বারুণী স্নান সম্পন্ন করেন।
মহাস্থানগড় দুর্গের ভেতরেই রয়েছে রাজা পরশুরামের প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ। আর এর ঠিক পাশেই রয়েছে একটি ঐতিহাসিক কূপ, যার নাম ‘জিয়ৎ কুণ্ড’ বা জীবন কূপ। জনশ্রুতি আছে, এই কূপের পানি পান করলে নাকি মৃত সৈনিকরা আবার জীবন ফিরে পেত, যা যুদ্ধক্ষেত্রে রাজা পরশুরামকে শক্তি জোগাত। পরবর্তীতে শাহ সুলতান বলখী (র.) এই কূপের অলৌকিক ক্ষমতা নষ্ট করার জন্য এতে গরুর মাংসের টুকরো ফেলেছিলেন বলে লোককাহিনী প্রচলিত আছে।

মহাস্থানগড়ের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে একটি উঁচু ঢিবির ওপর অবস্থিত হযরত শাহ সুলতান বলখী মাহীসওয়ার (র.)-এর মাজার শরীফ। বগুড়ার ইতিহাস ও সংস্কৃতির সাথে এই স্থানটি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। লোকগাথা ও ইতিহাস অনুযায়ী, ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বলখ (বর্তমান আফগানিস্তান) রাজ্যের এই রাজপুত্র রাজকীয় বিলাসিতা ত্যাগ করে সুফিবাদের টানে বাংলায় ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে চলে আসেন।
তাঁকে ‘মাহীসওয়ার’ বা মাছের পিঠে আরোহী বলা হয়, কারণ লোকশ্রুতি অনুযায়ী তিনি একটি বিশাল মাছ আকৃতির নৌকায় চড়ে করতোয়া নদী পার হয়ে পুণ্ড্রনগরে প্রবেশ করেছিলেন। তৎকালীন রাজা পরশুরামের সাথে তাঁর ঐতিহাসিক যুদ্ধ এবং পরবর্তীতে এখানে ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা বগুড়ার ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই পবিত্র স্থানে মানসিক প্রশান্তি ও জিয়ারতের উদ্দেশ্যে আসেন। বিশেষ করে প্রতি বছর বৈশাখ মাসের প্রথম দিনে এখানে এক বিশাল ওরস মোবারক ও মেলা বসে, যা পুরো উত্তরবঙ্গের অন্যতম বড় ধর্মীয় মিলনমেলা।
বগুড়ার মানুষের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সাথে মিশে আছে মেলা আর উৎসবের এক দারুণ উন্মাদনা। এখানকার মেলাগুলো কেবল কেনাকাটার জায়গা নয়, এগুলো একেকটি লোকসংস্কৃতির জীবন্ত উৎসব।
বগুড়ার মেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বিখ্যাত হলো পোড়াদহ মেলা। বগুড়া শহর হতে প্রায় ১১ কিলোমিটার পূর্বদিকে ইছামতি নদীর তীরে ‘পোড়াদহ’ নামক স্থানে সন্ন্যাসী পূজা উপলক্ষে প্রতি বছর এই মেলা বসে। কথিত আছে, আজ থেকে প্রায় সাড়ে চারশত বছর পূর্বে স্থানীয় সাধু-সন্ন্যাসীদের হাত ধরে এই মেলার সূচনা হয়েছিল। প্রতি বছর মাঘ মাসের শেষ বুধবারে এই মেলার আসর বসে।
এই মেলার প্রধান আকর্ষণ হলো চোখ কপালে তোলার মতো বিশাল বিশাল সাইজের নদীর তাজা মাছ (যেমন বাঘাইড়, বোয়াল, রুই, কাতল) এবং দানবাকৃতির সব ‘মাছ মিষ্টি’ বা ‘সন্দেশ’। মেলা প্রধানত একদিনের হলেও এর উৎসবের আমেজ চলে টানা তিনদিন ধরে।
মূল মেলার পরদিন, অর্থাৎ বৃহস্পতিবার একই স্থানে এবং একই সাথে আশেপাশের গ্রামগুলোতে চলে এক অনন্য আয়োজন, যার নাম ‘বউ মেলা’। যেহেতু মূল মেলার উপচে পড়া ভিড় আর নিরাপত্তার কারণে অনেক নারী ও মেয়েরা সেখানে যেতে পারেন না, তাই তাদের কেনাকাটা ও বিনোদনের জন্য এই বিশেষ ব্যবস্থা। বউ মেলায় শুধু নারীরাই প্রবেশ করতে এবং স্বাধীনভাবে কেনাকাটা করতে পারেন। এই মেলা উপলক্ষে আশেপাশের সব গ্রামে দূর-দূরান্ত থেকে জামাই ও মেয়েদের দাওয়াত দেওয়ার এক রাজকীয় সামাজিক রেওয়াজ রয়েছে।
বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় প্রতি বছর অত্যন্ত ধুমধামের সাথে আয়োজিত হয় কেল্লাপোষী মেলা। এই মেলাটিও কোনো নতুন আয়োজন নয়, আজ থেকে প্রায় ৪৫৭ বছর পূর্ব থেকে এই মেলাটি নিয়মিত হয়ে আসছে। প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের দ্বিতীয় রবিবারে এই মেলার আসর বসে, যা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে হাজারো মানুষের ঢল নামে। গ্রামীণ খেলনা, তৈজসপত্র আর লোকজ সংস্কৃতির নানা উপাদানে এই মেলা মুখরিত থাকে।
বগুড়া জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত—এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে এখানকার অনন্য কৃষি বৈচিত্র্যের কথা বলতেই হবে। বগুড়াকে বলা হয় বাংলাদেশের ‘সবজির রাজধানী’ এবং মসলা চাষের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
বগুড়ার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও গাবতলী উপজেলার চরাঞ্চলে উৎপাদিত লাল মরিচ পুরো দেশে এক নামে পরিচিত। যমুনা ও করতোয়ার পলিমাটিতে উৎপাদিত এই মরিচের ঝাল ও গাঢ় লাল রঙের কারণে দেশের বড় বড় মসলা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন রাঁধুনী, স্কয়ার, প্রাণ) বগুড়ার মরিচের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। চরের মাইলের পর মাইল জুড়ে মরিচ শুকানোর সেই লাল চাদরের মতো দৃশ্য বগুড়ার এক অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।
বগুড়ার উর্বর মাটির কারণে এখানে দেশের অন্যতম প্রধান ‘মসলা গবেষণা কেন্দ্র’ (Spices Research Centre) গড়ে তোলা হয়েছে। এখান থেকে সারা দেশের মসলা চাষের আধুনিক প্রযুক্তি ও বীজ সরবরাহ করা হয়। এছাড়া শিবগঞ্জ উপজেলার মহাস্থান হাট বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম পাইকারি সবজির বাজার, যেখান থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রাক সবজি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়।
বগুড়া কেবল ইতিহাসেই ধনী নয়, এটি বর্তমান বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও শিল্প কেন্দ্র। জেলাটিতে কৃষি, ম্যানুফ্যাকচারিং এবং পর্যটন শিল্পের এক দারুণ যুগলবন্দী দেখা যায়।
বগুড়াকে বলা হয় বাংলাদেশের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং বা হালকা প্রকৌশল শিল্পের জন্মস্থান। বিশেষ করে কৃষি যন্ত্রপাতি, শ্যালো ইঞ্জিনের লাইনার, পিস্টন এবং বিভিন্ন গাড়ির খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরিতে বগুড়ার বিসিক (BSCIC) শিল্প নগরী পুরো দেশে একচেটিয়া নেতৃত্ব দেয়। দেশের মোট চাহিদার একটি বিশাল অংশ এখানেই উৎপাদিত হয়।
বগুড়া উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার হওয়ায় এটি একটি প্রধান পরিবহন ও যোগাযোগ কেন্দ্র। জেলাটিতে উন্নত সড়ক যোগাযোগের পাশাপাশি রয়েছে বগুড়া রেলওয়ে স্টেশন, যা সান্তাহার জংশনের মাধ্যমে পুরো দেশের সাথে যুক্ত। এছাড়া বিমান যোগাযোগের জন্য এখানে গড়ে তোলা হয়েছে বগুড়া বিমানবন্দর, যা এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

এখানে নিবন্ধটির তৃতীয় ও শেষ অংশ উপস্থাপন করা হলো, যেখানে বগুড়ার প্রাকৃতিক সংযোগের বাস্তবতা, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং এই মাটির সন্তান হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখানো বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের জীবনগাথা বিশদভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে:
বগুড়া জেলাটি মূলত যমুনা ও করতোয়া নদীর পললভূমিতে গঠিত এক উর্বর জনপদ। মূল লেখাটিতে দুধকুমার নদী বা মহানন্দা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের কথা উল্লেখ থাকলেও, ভৌগোলিক মানচিত্র অনুযায়ী দুধকুমার নদী মূলত কুড়িগ্রামে এবং মহানন্দা অভয়ারণ্যটি পঞ্চগড় ও ভারতের শিলিগুড়ির সীমান্তে অবস্থিত। তবে বগুড়ার নিজস্ব প্রাকৃতিক রূপ কোনো অংশেই কম নয়।
বগুড়ার বুক চিরে বয়ে গেছে যমুনা, করতোয়া, ইছামতি, নাগর আর বাঙালি নদী। বিশেষ করে বর্ষাকালে যমুনার চরাঞ্চলের রূপ এবং শুকনো মৌসুমে বাঙালি নদীর শান্ত অববাহিকা প্রকৃতিপ্রেমীদের দারুণভাবে টানে। এছাড়া শেরপুর ও শিবগঞ্জের পাহাড়ি লাল মাটির টিলা এবং চরাঞ্চলের দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ এই জেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে এক অনন্য মাত্রা দিয়েছে।
বগুড়া কেবল বাঙালির নয়, এটি বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও সংস্কৃতির এক চমৎকার মিলনমেলা। এই জেলায় সুদীর্ঘকাল ধরে সাঁওতালসহ বেশ কিছু ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ তাঁদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখে বসবাস করছেন।
এই সমৃদ্ধ আঞ্চলিক সংস্কৃতিকে ধারণ ও প্রদর্শন করার জন্য এখানে গড়ে উঠেছে ‘বগুড়া জাদুঘর’ (মহাস্থানগড় জাদুঘর সংলগ্ন) এবং শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ‘বগুড়া জেলা পরিষদ মিলনায়তন’। এছাড়া শহরের ‘নওয়াববাড়ী’ বা বর্তমানের সান্তাহার ও দুপচাঁচিয়ার স্থানীয় লোকজ উৎসবগুলো বগুড়ার অসাম্প্রদায়িক ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির এক অনন্য দলিল।
বগুড়ার মাটি যেমন উর্বর, তেমনি এই মাটির মানুষেরাও রাজনীতি, সমাজ সংস্কার ও ইতিহাসের পাতায় গভীর দাগ কেটে গেছেন। বগুড়ার নাম নিলেই যেসকল ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা অবধারিতভাবে চলে আসে, তাঁরা হলেন:
আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাসের ধুলোবালি, বিশ্বজয়ী ক্ষীরসা ছোঁয়া দইয়ের অনন্য স্বাদ, ইছামতি নদীর ধারের সাড়ে চারশ বছরের পুরনো মেলার হুল্লোড়, যমুনার চরের লাল মরিচের ঝাঁঝ আর আধুনিক লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং অর্থনীতির কর্মব্যস্ততা—এই সবকিছুর এক অদ্ভুত, রাজকীয় ও মানবিক মিশ্রণই হলো আমাদের বগুড়া জেলা। এটি কেবল মানচিত্রের একটা নির্দিষ্ট ভূখণ্ড নয়; এটি বাংলাদেশের অতীত গৌরবের হৃৎপিণ্ড এবং ভবিষ্যতের এক অর্থনৈতিক পরাশক্তি। অতীতের সেই ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করেই আজকের বগুড়া প্রতিনিয়ত এগিয়ে চলেছে এক নতুন শ্রেষ্ঠত্বের অভিমুখে।
মন্তব্য